
আজ খবর (বাংলা) [রাজ্য] কলকাতা,পশ্চিমবঙ্গ ০৭/০৯/২০২৬ঃ রবিবার মধ্য কলকাতার বউবাজারে শতদল সংঘের দুর্গাপুজোর খুঁটিপুজো অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সহ বিজপির অন্যান্য নেতা। সেখানে শমীক ভট্টাচার্য মন্তব্য করেন ১৯৪৬ সালের দাঙ্গার সময়ে গুপ্তা ও জয়সওয়ালদের মতো অবাঙালি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নিজেদের সম্পদ উজাড় করে তলোয়ার তৈরির জন্য লোহা দিয়েছিলেন এবং বাঙালিদের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। শমীকের কথায়, “উত্তর কলকাতায় দাঁড়িয়ে একটি কথা বলতেই হবে, গুপ্তা এবং জয়সওয়ালরা যদি এখানে না থাকতেন, যদি তাঁরা তাঁদের সম্পূর্ণ সম্পদ ব্যয় করে তলোয়ার তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় লোহা না দিতেন, তাহলে আজ আমরা উত্তর কলকাতায় যে ভদ্রলোক এবং অভিজাত বাঙালিদের দেখতে পাচ্ছি, তাঁদের অস্তিত্বই থাকত না।” উত্তর কলকাতার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালি ও অবাঙালি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের সহাবস্থান রয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি থেকে শুরু করে নাগরিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার কথাও উঠে আসে।
সেই প্রেক্ষাপটে শমীক ভট্টাচার্যের মন্তব্য নতুন করে সেই সম্পর্ক এবং শহরের জনবিন্যাস নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় এবং উত্তর কলকাতার বিজেপি সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ। শমীক আরও বলেন, কলকাতাকে বুঝতে হলে উত্তর কলকাতায় আসতে হবে এবং কঠিন সময়ে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাশে দাঁড়িয়েছিল। শমীকের এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দলগুলি। তৃণমূলের মুখপাত্র তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ এটিকে “বাঙালিদের অপমান” বলে অভিহিত করেন। তাঁর বক্তব্য, বাঙালির নিজস্ব ইতিহাস, ঐতিহ্য ও পরিচয় রয়েছে। গুপ্তা বা জয়সওয়ালরা পাশে না থাকলে বাঙালির অস্তিত্ব থাকত না—এমন মন্তব্য তিনি প্রত্যাশা করেননি। কংগ্রেসের অভিযোগ, শমীকের এই মন্তব্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভোটের রাজনীতির অংশ। সিপিএম এই মন্তব্যকে “ঐতিহাসিকভাবে ভুল” বলে নিন্দা জানিয়েছে । বিরোধীদের একাংশের দাবি, এই ধরনের মন্তব্যের মাধ্যমে বাংলার বাঙালি সমাজের ঐতিহাসিক ভূমিকা এবং নিজস্ব পরিচয়কে খাটো করা হচ্ছে।

অন্যদিকে, শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্যকে সমর্থন করে বিজেপির একাংশের দাবি, তাঁর বক্তব্যের মূল উদ্দেশ্য ছিল উত্তর কলকাতার সামাজিক সম্প্রীতি এবং পারস্পরিক নির্ভরতার ইতিহাস তুলে ধরা। তাঁদের মতে, কলকাতার ইতিহাসে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের অবদান রয়েছে এবং সেই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা উচিত নয়। বক্তব্যের একটি নির্দিষ্ট অংশকে সামনে রেখে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। উত্তর কলকাতার ইতিহাসে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের ভূমিকা অবশ্য নতুন কোনও বিষয় নয়। শহরের বহু পুরনো বাজার, ব্যবসাকেন্দ্র এবং বাণিজ্যিক এলাকার সঙ্গে বিভিন্ন অবাঙালি ব্যবসায়ী পরিবারের নাম জড়িয়ে রয়েছে। একইভাবে শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি এবং সমাজসেবার ক্ষেত্রেও বহু বাঙালি পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।

ফলে কলকাতার নাগরিক ইতিহাস মূলত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সম্মিলিত অংশগ্রহণের ইতিহাস বলেই মনে করেন ইতিহাসবিদদের একাংশ। রাজনৈতিক মহলের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে কলকাতার জনবিন্যাস, বাঙালি পরিচয় এবং অবাঙালি সম্প্রদায়ের ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য ক্রমশই সামনে আসছে। তার মধ্যেই শমীক ভট্টাচার্যের এই মন্তব্য নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে “গুপ্তা, জয়সওয়ালরা” প্রসঙ্গ তুলে উত্তর কলকাতার বাঙালি সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে অবাঙালি সম্প্রদায়ের উপস্থিতিকে যুক্ত করায় রাজনৈতিক মহলে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আগামী দিনে আরও রাজনৈতিক তরজা তৈরি হয় কি না, এখন সেটাই দেখার। তবে শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য ইতিমধ্যেই সামাজিক মাধ্যমে এবং রাজনৈতিক মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।

কলকাতার বহুত্ববাদী চরিত্র, বাঙালি পরিচয় এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐতিহাসিক অবদান নিয়ে ফের শুরু হয়েছে বিতর্ক। দুর্গাপুজোর আবহেই এই মন্তব্য আসায় তা আরও বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। শমীক তাঁর বক্তব্যে দুর্গাপুজোর সময় বাংলার মানুষের ঐক্যবদ্ধ থাকার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন। কিন্তু ১৯৪৬-এর দাঙ্গার প্রেক্ষাপট টেনে গুপ্তা ও জয়সওয়ালদের ভূমিকা এবং উত্তর কলকাতার বাঙালি সমাজের অস্তিত্ব নিয়ে তাঁর মন্তব্যই এখন রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে। বক্তব্যটি ঘিরে ইতিহাস, পরিচয় এবং ভোটের রাজনীতি—তিনটি প্রশ্নই নতুন করে সামনে এসেছে।

আরও খবর ও সর্বশেষ আপডেট জানতে নিয়মিত চোখ রাখুন আমাদের ওয়েবসাইটে www.aajkhabor.in




[…] আরও পড়ুন https://aajkhabor.in/shamik-bhattacharya-gupta-jaiswal-comment-controversy-durga-puja/ […]